সুন্দর আচরণের বিনিময় জান্নাত

সুন্দর আচরণের বিনিময় জান্নাত

উত্তম গুণের অধিকারীরা সবার কাছে আকর্ষণীয় ও প্রিয় হয়ে ওঠে। সুন্দর গুণাবলির মাধ্যমে তৈরি হয় শান্তি, মৈত্রী ও ভালোবাসা। তাই সুশৃঙ্খল সুখী সমাজ নির্মাণে উত্তম গুণাবলির ভূমিকা অপরিসীম। আর মহানবী (সা.) ছিলেন উত্তম চরিত্রের মূর্ত প্রতীক। তার জীবনের পরতে পরতে উত্তম গুণের অসংখ্য দ্যুতি রয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা কলম, আয়াত : ৪)

জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ও কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে কাছে থাকবে যে তোমাদের মধ্যে অধিকতর সুন্দর চরিত্রের অধিকারী। আর আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ও আমার কাছ থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে বাচাল ও অহংকারী।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২১০৮)

মানুষের আচার-ব্যবহার, কথাবার্তা ও কাজকর্মে অন্তরের সজীবতা ও হৃদয়ের সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে। তাই ইসলাম সবার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছে। উত্তম গুণাবলিগুলো বর্ণনা করা হলো

মানুষের সঙ্গে সুন্দর কথা : সবার সঙ্গে সুন্দরভাবে কথা বলা সদকার সমতুল্য। সুন্দর কথা মানুষের অন্তরে বেশি প্রভাব ফেলে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘সূর্য উদিত হওয়া প্রতিটি দিবসেই মানুষের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর সদকা দেওয়া আবশ্যক হয়। দুজনের মধ্যে বিবাদ নিরসন করা সদকার সমতুল্য। কাউকে বাহনে উঠতে কিংবা কোনো সামগ্রী বাহনে তুলে দিতে সাহায্য করা সদকা। সুন্দর কথা বলা সদকা। নামাজে যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ সদকা। পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা সদকা।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০০৯)

অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার : সময়ের মূল্য অপরিসীম। তাই একজন মুসলিমের অনর্থক কাজে লিপ্ত হওয়া অনুচিত। ইসলামের সৌন্দর্য হলো অনর্থক কাজকর্ম পরিহার করা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো অনর্থক কাজ পরিহার করা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৮)

অতিথিপরায়ণতা : অতিথির সমাদর ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য। সাধ্যানুযায়ী অতিথির আদর-আপ্যায়ন করা মুসলিমের অন্যতম কর্তব্য। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেউ আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ইমান আনলে সে যেন কল্যাণকর কথা বলে নতুবা চুপ থাকে। কেউ আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ইমান আনলে সে যেন প্রতিবেশীকে সম্মান করে। কেউ আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ইমান আনলে সে যেন অতিথির সমাদর করে।’ (বোখারি, হাদিস : ৬০১৮)

বিনয় ও কোমলতা : কোমল আচরণের মাধ্যমে মানুষ সবার প্রিয় হয়ে ওঠে। বিনয় ও কোমলতার ছোঁয়ায় মন হয়ে ওঠে আনন্দঘন। তাই রাসুল (সা.) সবার সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ কোমলতা পছন্দ করেন। আল্লাহ কোমলতার বদলায় যা দেন, কঠোরতার কারণে তা দেন না।’ (বোখারি, হাদিস : ২৫৯৩)

মানুষের জন্য কল্যাণ কামনা : সবার জন্য কল্যাণের প্রত্যাশা করা একজন মুসলিমের অন্যতম গুণ। পরামর্শ, উপদেশ, নির্দেশনাসহ অসংখ্য উপায়ে মানবসমাজের সব সদস্যের কল্যাণ কামনা করা যায়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘একজন মুসলিমের ওপর অন্য মুসলিমের ছয়টি অধিকার আছে।’ তখন বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, তা কী? তিনি বলেন, “মুসলিমের সঙ্গে তোমার দেখা হলে সালাম দেবে। তোমাকে ডাকলে সাড়া দেবে। তোমার কাছে পরামর্শ চাইলে উত্তম পরামর্শ দেবে। হাঁচি দিয়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে তুমি তার উত্তরে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলবে। অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে। আর মারা গেলে তার জানাজায় অংশগ্রহণ করবে।” (মুসলিম, হাদিস : ২১৬২)

সত্যবাদিতা : সত্য কথা মানুষের জীবনকে সুন্দর করে। তাই সত্যবাদিতা মুমিনের ভূষণ। সফলতার পথে নিয়ে আসে সততা। আর ধ্বংসের পথে পৌঁছে দেয় মিথ্যা ও কপটতা। তাই মহান আল্লাহ সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের কর্ম ত্রুটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন, যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে, তারা অবশ্যই সফলকাম হবে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৭০-৭১)

ঝগড়া-বিবাদ নিরসন : ঝগড়া-বিবাদ নিরসনে মানুষ এগিয়ে এলে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা অটুট থাকবে। তাই ঝগড়া নিরসনকারী পুণ্যের অধিকারী হবে। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়ে অধিকতর উত্তম কাজের কথা বলব না?’ সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, অবশ্যই বলবেন। তিনি বললেন, ‘পরস্পরের মধ্যে বিবাদ নিরসন করা। কারণ পরস্পরের মধ্যে থাকা বিবাদই সবকিছু ধ্বংস করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫০৯)

অন্যের প্রতি ভাল ধারণা পোষণ : মানুষের প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করা সব মুসলিমের কর্তব্য। অন্যের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণের কারণে মনোমালিন্য ও হিংসা-বিদ্বেষ তৈরি হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা বেশির ভাগ ধারণাকে পরিহার করো। কেননা অনেক ধারণা পাপের শামিল।’ (সুরা হুজরাত, আয়াত : ১৩)

ক্রোধ সংবরণ : প্রাত্যহিক জীবনে অন্যের ওপর ক্রোধান্বিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে ক্রোধ দমন করা ও প্রতিশোধ নেওয়া থেকে বিরত থাকা মুসলিমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং বড় সওয়াবের কাজ। রাগ দমনকারীর মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা রবের ক্ষমার দিকে এবং আসমান ও জমিনের সমান বিস্তৃত জান্নাতের দিকে দৌড়ে যাও, যা খোদাভীরুদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান, আয়াত : ১৩৩-১৩)

বিপদে ধৈর্য ধারণ : বিপদাপদের মুহূর্তে ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কঠিন সময়ে অস্থির না হয়ে আল্লাহর কাছে পুণ্যের প্রত্যাশা করা জরুরি। কারণ ধৈর্যের ফল অনেক সুখকর। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করল এবং ধৈর্য ধারণ করল, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নিষ্ফল করেন না।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৯০)