খালিয়াজুরী খাদ্য গুদামে ধান ক্রয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ

খালিয়াজুরী খাদ্য গুদামে ধান ক্রয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ

এ কে এম আব্দুল্লাহ্, নেত্রকোনা: দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের লক্ষ্যে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সরকারি ভাবে ধান ক্রয়ে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচনের কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না খালিয়াজুরী খাদ্য গুদামে। অদ্যাবদি তৈরি করা হয়নি প্রকৃত কৃষকদের নামের তালিকা। প্রভাবশালীদের ধান নেয়া হচ্ছে গুদামে। লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন না করে তাদের খেয়াল-খুশি মতো ধান ক্রয় করায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে খাদ্য গুদামের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ধান ক্রয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা স্বীকার করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

     
নেত্রকোনায় এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। হাওরাঞ্চলের কৃষকরা তাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের একমাত্র ফসল ঘরে তুলতে পেরে মহা খুশি। সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২৬ এপ্রিল থেকে সারা দেশে একযোগে ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়। এবার খালিয়াজুরীতে সরকারি ভাবে ২ হাজার ৮ শত ৩৮ মেট্রিক টন ধান ও ৫০ মেট্রিক টন চাল ক্রয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সরকার দেশে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার ও কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে প্রকৃত কৃষকদের নামের তালিকা প্রনয়ণ ও তাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের নির্দেশ দিলেও অদ্যাবধি খালিয়াজুরীতে প্রকৃত কৃষকদের নামের তালিকা তৈরী করা হয়নি। খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে ধান ক্রয় করছে। এতে খাদ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রকৃত কৃষকরা সরাসরি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।  বঞ্চিত হচ্ছেন তাদেও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাওয়া থেকেও। এ নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে । 
    
খালিয়াজুরী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অজিত কুমার দাস বলেন, প্রকৃত কৃষকের তালিকা তৈরি না করেই খাদ্য গোদামের কর্মকর্তা তার পছন্দ মতো প্রভাবশালী কৃষকদেরকে সরকারি খাদ্য গুদামের বস্তা দিচ্ছে। আমি একজন প্রকৃত কৃষক হিসেবে বস্তা আনতে গেলে দেই-দিচ্ছি বলে সময় ক্ষেপণ করছে।
     
খালিয়াজুরী সদরের কৃষক নান্টু দে, রতন সরকারসহ আরো অনেক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধান এনে গুদামের সামনে রাখছি অথচ আমাদের ধান গুদামে ঢুকানো হচ্ছে না। অন্যদের ধান গুদামে ঢুকানো হচ্ছে। সরকারিভাবে ধান বিক্রি করতে না পেরে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত কৃষকরা। শুধু খলিয়াজুরী সদর ইউনিয়ন ছাড়া অন্য কোনো গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকেও নেয়া হচ্ছে না ধান। খাদ্য কর্মকর্তা তার পছন্দের কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করছেন। লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচনের আগেই রাতের আঁধারে প্রায় ৮ শত মেট্রিক টন ধান দিয়ে গুদাম ভরে রেখেছেন খাদ্য  কর্মকর্তা। ১৭ মে কৃষক নির্বাচনের কথা থাকলেও এখনো হয়নি কৃষক নির্বাচন। 
    
খালিয়াজুরী সদরের নিতেষ বিশ্বাস, রনু সরকার, রোয়াইল গ্রামের প্রদীপ কুমার তালুকদার (মন্টু), সদর ইউনিয়নের গছিখাই গ্রামের হামিদ আলী বলেন, সরকারী বস্তার জন্য গুদামে গেলে খাদ্য কর্মকর্তা বস্তা দেয়ার  নামে টালবাহানা করেন।
   
নান্টু ও রতন বলেন, ধান এনে গুদামে রাখায় বৃষ্টিতে ভিজছে তাদের ধান।  তারপরেও আমাদের ধান নিচ্ছে না। রাতের অন্ধকারে পরে যারা আনছে তারার ধান দিয়ে গুদাম ভরছে। আমরার ধান নষ্ট হচ্ছে, এখন আমরা কী করব?

খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, আমাদের এখানে অ্যাপস না থাকায় আমরা উন্মুক্তভাবে কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করছি।
     
খালিয়াজুরী গুদামের ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা (ওসি, এলএসডি) দীপায়ণ  দত্ত মজুমদার বলেন, আমাদের কাছে মেইল আছে, যে সব উপজেলায় অনলাইনে আবেদনের সুযোগ নেই, সে সব উপজেলায় লটারির আগে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধান ক্রয়ের নির্দেশ রয়েছে। তাই আমরা এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধান নিচ্ছি। 
     
অভ্যন্তরীণ ধান ক্রয় সংগ্রহ বিষয়ে জানতে চাইলে খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ ছানোয়ারুজ্জামান তালুকদার জোসেফ বলেন, এ বিষয়ে আমি অবগত নই, কে বা কারা গুদামে ধান দিচ্ছে। তবে তালিকায় খালিয়াজুরী ইউনিয়নের কোন কোন কৃষক খাদ্য গুদামে ধান দিয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়ে  খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত পত্র প্রেরণ করেছি। 
    
সরকারি কার্য দিবসে খাদ্য গুদামে গেলে খালিয়াজুরী খাদ্য নিয়ন্ত্রককে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রুবাইদুর রানা বলেন, আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধান সংগ্রহ করছি। অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ব্যতীত আমার পক্ষে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। 
   
এ ব্যাপারে খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম আরিফুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমার কাছে মৌখিক অভিযোগ এসেছে, কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি।  অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।