বিরহী কবি মাজেদুল হক এর "চোখের জলে নদী" পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখেছেন -অসীম

বিরহী কবি মাজেদুল হক এর "চোখের জলে নদী" পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখেছেন -অসীম

সাহিত্য ইকরা ডেস্কঃ চোখের জলে নদী। বিরহী কবি মাজেদুল হক। নাম ও প্রচ্ছদের দারুণ মিল। সাহিত্য মানবজীবনের সুখ-দুঃখমাখা কাঁদাজলের অব্যক্ত কথা গুলো নির্লজ্জের মতো প্রকাশ করে। চোখের জলে নদী কাব্যগ্রন্থটিও লেখকের কলমে জীবনের থরে থরে সাজানো আনন্দ ব্যাথার এজলাস।

শেখ মোহাম্মদ মাজেদুল হক। যিনি বিরহী কবি মাজেদুল হক নামেই সাহিত্য সমাজে পরিচিত। সত্তরের দশকে শেষ দিকে ময়মনসিং বিভাগের নেত্রকোণা সদর উপজেলার কেগাতি ইউনিয়নের পাটলি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম শেখ পরিবারে জন্ম। লেখালেখি তার জীবনের অনেকাংশ জুড়ে আছে। তবে "চোখের জলে নদী” তার লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ।

বইটির শুরুতে কবি ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর ননী গোপাল সরকার এর সুনিপুণ হাতে লেখা ভূমিকা পড়লেই জ্ঞানী পাঠকের পুরো বইটা পড়ার খেদ মিটে যাবে।

একজন সহজ সরল স্বভাবের ঠান্ডা মাথার নির্লোভ নিরহংকার মানুষ কবি মাজেদুল হক। তার লেখায় বরাবরই ফুটে উঠে প্রেম, দ্রোহ, বিচ্ছেদ বিরহ। একজন দুঃখবিলাসি কবি। নিজের জীবনের ছাপ এসে বার বার আছড়ে পড়ে তার কলমের ডগায়। বুদ্ধিমান পাঠক কবির লেখাগুলো পড়তে পড়তে একদিন বুঝতে পেরেছিলেন, বিরহ বেদনার সুর যেন তার নিত্যকার সঙ্গী। অবশেষে সুধী পাঠক মহল তাকে বিরহী কবি উপাধিতে ভূষিত করেছেন।

প্রকৃত অর্থেও কবির লেখায় ও পাঠকের দেয়া নামের মধ্যে বিশাল মিল। তাই আমিও বিশ্বাস করি বিরহের বজ্রপাতে আছড়ে পড়তে পড়তে আমাদের বিরহী কবিও একদিন বিরহ জয় করে জীবনের শত প্রতিকূলতায় মোকাবিলা করবেন।

চোখের জলে নদী হয়না, খালও হয়না। হয়না বদ্ধ কোন জলাশয় পুষ্করিণী। তবুও লেখক তার বইয়ে সুনিপুণ হাতে প্রমাণ করেছেন চোখের জলে নদী হয় না শুধু, সাগর, মহা সাগরও হয়।

এসময়কার আলোচিত বিভাস প্রকাশনীর শ্রদ্ধেয় রামশংকর দেবনাথ এর প্রকাশনায় ও প্রচ্ছদ শিল্পী পিয়াস খানের তুলিতে দেড়শ টাকা মুল্যের ৬৪ পৃষ্ঠার এই বইটি অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১ এ প্রথম প্রকাশ হয়েছে। প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া মতো একটি চমৎকার বই “চোখের জলে নদী”।

বইটির নাম শুনলেই বোঝা যায় বইটি মূলত মানবজীবনের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে লেখা একটি বাস্তবধর্মী কাব্যগ্রন্থ। মানবজীবন কখনোই পরিপূর্ণ হয় না কিছু কিছু অপূর্ণতা রয়ে যায় অপ্রাপ্তিতে। বইটির প্রচ্ছদে এই চোখের জলে নদীর স্বচ্ছ ভাব ফুটে উঠেছে।

লেখক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করেছেন বইটি উৎসর্গ করে। তিনি তাঁর প্রয়াত পিতামহ ও বাবা-মা'র করকমলে উৎসর্গ করে কিছুটা ঋণ পরিশোধ করতে চেয়েছেন। যদিও সেই ঋণ পরিশোধিবার নয়। তবুও সাহিত্য সমাজের নবীন এই লেখক চেষ্টা করেছেন সাহিত্যের এই ধারাটিকে অমর করতে।

বইটিতে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, বইয়ের লেখক পরিচিতিটা লিখেছে কবির সহধর্মিণী। যা সাহিত্যাকাশে বিরল ঘটনা। সাধারণত কবি সাহিত্যিকদের অন্তঃপুরবাসিনীরা কবির লেখাকে খুব একটা মূল্যই দেয়না, বরং উদ্ভট পাগলামি ও যা-তা বলে কটাক্ষ করে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে একটা ব্যাতিক্রম সুস্থ ভাব লক্ষ্য করা গেলো। এই তরিকায় কবি একটু গতানুগতিক ধারার বিরোদ্ধে হাঁটতে চেয়েছিলেন। তিনি স্বামীর সাহিত্যরস স্ত্রীর কাছে নেকামো নয়, এই বিষয়টাকে প্রমাণ করেছেন।

মোট ৫২টি কবিতার এই বইখানিতে লেখক তিলে তিলে জমিয়ে রাখা অনুভূতিগুলো অকপটে বলে গেছেন। তার কবিতায় ফুটে উঠেছে মার্তৃভাষার টান, তার উড়াও পতাকা কবিতায় আছে দেশপ্রেম। বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে তিনি সুনিপুণ এঁকেছেন। ধর্মীয় বিষয় নিয়েও লিখেছেন গরিবের হজ্ব। ফুটেছে নেত্রকোণার কংসের মহিমা। কবিতার ছন্দগুণ তুলে এনেছেন কবি ছন্দের গতিতে। ঠিকানা কবিতায় জীবনের এক আখ্যান তুলে ধরেছেন। অভিযোগ কবিতায় তিনি কিছু প্রশ্ন রেখেছেন। প্রেম ও অপহরণ কবিতায় কবি ফুটিয়েছেন জৈবিক প্রেম ও বিরহের করুন সুর। জনতার দাবি কবিতায় বিদ্রোহের সুর শোনা যায়। চোখের জলে নদী কবিতায় কবি মায়ের ভালোবাসা তুলে এনেছেন।

বিরহী কবি মাজেদুল হক তাঁর "চোখের জলে নদী" কাব্যগ্রন্থে প্রথাগত ছন্দের পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন বেশ কিছু নতুন ছন্দ কাঠামো বা ছন্দরীতি তাই অভিজ্ঞ ছান্দসিক কবিগণ বিরহী কবিকে নতুন ছন্দরীতির প্রবর্তক হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।

বই থেকে ভালো লাগার কিছু উক্তি আমি তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি।
১। সে কাঁদে আমিও কাঁদি ব্যথিত দু'জন
     বিয়ের নামে হয়েছে সে অপহরণ

২। আমায় দেখিতে যেন লুকোচুরি খেলা
     কতটুকু ভালোবাস বুঝেছি অবেলা

৩। সবার কান্না থামে, মা কাঁদে নিরবধি
     বুকে জ্বালা অশ্রু ঝরে ঝর্ণা থেকে নদী

৪। শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসে সেই ছবি
     সেতো প্রাণপ্রিয় আমার বিরহী কবি

৫। অপেক্ষার প্রতিটি প্রহর যেন হাজার বছর

আমাকে যদি এই বই সম্পর্কে মন্তব্য করতে বলা হয়, তবে যে কথাগুলো না বললেই নয় তা হলো- বর্তমান সময় উপযোগী একই সাথে বাস্তবতাবাদী একটি গ্রন্থ। এতে কবি বর্তমান সমাজে বিভিন্ন দিক খুব স্বচ্ছ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এতে ফুটে উঠেছে গ্রাম বাংলার বিভিন্ন দৃশ্য। বর্তমান সমাজে সম্পর্কের বিচ্ছেদ একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা এতে লেখক দারুণ ভাবে এই সমস্যা সমাধান দিয়েছে। এই বইয়ের প্রত্যেকটি উক্তির ভিতরে আমরা নিজেদের খুঁজে পাবো। যেগুলো লেখক একটু একটু করে জমিয়ে রেখেছিলেন।

আর বই সমালোচনা করার কোন যোগ্যতাই আমার নাই, তবুও নিজের ভেতরের উপলব্ধিটা বলি, বইয়ের ভালো লাগা, খারাপ লাগা থাকে। কিন্তু এই বইটা পড়তে একটুও খারাপ লাগেনিই বরং পড়তে পড়তে কেবল কিছু জানার আকাঙ্ক্ষাই বাড়ছিল, বইটি সত্যিই অসাধারণ।

পরিশিষ্টে বলতে চাই, জীবনের চলার পথ বন্ধুর। কখনোই ফুলেল শামিয়ানা নয়। আমি মনে করি বইটি নব প্রেমিকের চিন্তাধারার উপর একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে যা জীবনকে সঠিক পথে পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এবং বুঝতে পারবে বিরহ বিচ্ছেদের অনলে দগ্ধ হয়ে আত্মহুতি দেয়াই কোন সমাধান নয়। বেঁচে থাকাটাই জীবনের স্বার্থকতা।