চার দফা তদন্ত শেষে স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীই আসামী 

চার দফা তদন্ত শেষে স্ত্রী হত্যার দায়ে স্বামীই আসামী 

সমরেন্দ্র বিশ্বশর্মা কেন্দুয়া প্রতিনিধি :
 প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গিয়ে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী রহিমা আক্তারকে হত্যা করে ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে অবশেষে স্বামী নিজেই এখন আসামী হলেন। চার দফা তদন্ত শেষে পুলিশ রহিমা আক্তারের স্বামী লিটন মিয়া সহ আদালতে ৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জসিট দাখিল করেন।
হত্যা ঘটনাটি সংঘটিত হয় ২০১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর কেন্দুয়া উপজেলার মাসকা ইউনিয়নের পানগাঁও গ্রামে। চারদফা তদন্ত শেষে কেন্দুয়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার (বর্তমানে হবিগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি প্রাপ্ত) মাহমুদুল হাসান চলতি বছরের গত ৮ আগস্ট নেত্রকোনা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রহিমা আক্তারের স্বামী লিটন মিয়া সহ ৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জসিট দাখিল করেন। অভিযুক্ত অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছেন একই গ্রামের সবুজ মেম্বার, সুমন মিয়া, আল-আমিন ওরফে আলম ও মোহন মিয়া। 
তদন্ত কর্মকর্তা চার্জসিটে উল্লেখ করেন, রহিমা আক্তারের স্বামী ও মামলার বাদী লিটন মিয়া জন্মসূত্রে পানগাঁও গ্রামের বাসিন্দা নন। তিনি নানা বাড়িতে থেকে বসবাস করতেন। নিহত রহিমা আক্তার তার দ্বিতীয় স্ত্রী। রহিমা অসুস্থ থাকায় প্রায়ই তাদের স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া বিবাদ হত। এদিকে লিটনের সঙ্গে প্রতিবেশি নাজমুল হকের সঙ্গে জমির সীমানা ও ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ চলছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে পরিকল্পিত ভাবে লিটন মিয়া ও তার ছেলে রহিমা আক্তারকে নিয়ে জমির সীমানা ঠিক করতে যায়। তা দেখে নাজমুল হকের ছেলে রতন মিয়া বাঁধা দিলে তাকে বেধড়ক মারপিট করে। ছেলের চিৎকার শুনে নাজমুল হক ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে তাকেও মারটিপ করে লিটন মিয়া ও তার লোকজন। এক পর্যায়ে রতন মিয়ার অবস্থা আশংকা জনক দেখে লিটন মিয়া তার স্ত্রীকে শাবল দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়।
২০১৭ সালে ৪ জানুয়ারী স্ত্রী হত্যার অভিযোগ এনে লিটন মিয়া বাদী হয়ে এজাহারে ১৩ জনের নাম উল্লেখ সহ অজ্ঞাতনামা আরো ৫/৬ জনকে আসামী করে কেন্দুয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় শামসুল হক, নূরুল হক, জজ মিয়া, মোজাম্মেল হক, আজহারুল হক, রবিকুল, ফারুক মিয়া, শাহাবুল, নাজমুল হক, রতন মিয়া, সবুজ মিয়া, আব্দুল ওয়াদুদ, আব্দুল কুদ্দুসের নাম উল্লেখ করা হয়। থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করার কিছুদিনপর মামলার তদন্ত চলে যায় সিআইডির হাতে। ১৬ মাস সিআইডি পুলিশ তদন্ত শেষে এজহার নামীয় ৮ আসামীকে অব্যাহতি দিয়ে নারী সহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সিআইডির অভিযোগপত্রে এজাহার নামীয় নাজমুল হক, রফিকুল, রতন মিয়া, সবুজ মিয়া, আব্দুল ওয়াদুদ এবং তদন্তে প্রাপ্ত জহুরা বেগম, আব্দুর রশিদের ছেলে শাহজাহান, সেলিনা আক্তার, হাজেরা বেগম ও নাজমা খাতুনের নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়। পরে এই অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে বাদী আদালতে নারাজী দাখিল করলে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিকেশন (পি আই বিকে) দায়িত্ব দেয়া হয়। পিআইবির কর্মকর্তা দেড় বছরের তদন্ত শেষে সিআইডির তদন্তে অব্যাহতি পাওয়া কয়েকজনের নাম যুক্ত করে ২০১৯ সালের ২২ ফেব্রæয়ারি ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পিআইবির অভিযোগপত্রেও বাদীর আপত্তি থাকায় তিনি আদালতে ফের নারাজি দেন। আদালত মামলাটি জেলা গোয়েন্দা শাখা ডিবিকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। গোয়েন্দা শাখার এসআই শরিফুল হক মামলাটির তদন্তকালিন সময়ে পূর্বের দুটি সংস্থার তদন্ত রিপোর্টে খুনের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হয়নি বলে দাবী করেন। তবে খুনের নেপথ্যে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র এবং নিরপরাধ ব্যাক্তিদের অব্যাহতি দানের জন্য নেত্রকোণা জেলা পুলিশ সুপার বরাবর আবেদন করে। পরে গোয়েন্দা শাখার এসআই শরিফুল হক ২০১৯ সালে ১৭ ডিসেম্বর ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। গত ২০২০ সালের ১০ ফেব্রæয়ারী অভিযোগপত্রের নারাজির শুনানীতে আদালত স্বপ্রনোদিত হয়ে পুনরায় অধিকতর তদন্তের জন্য কেন্দুয়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব প্রদান করেন। তদন্ত কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, স্ত্রী হত্যার ঘটনায় স্বামী লিটন মিয়া জড়িত। প্রতিপক্ষের লোকদের ফাঁসাতে গিয়েই তিনি তার স্ত্রীকে শাবল দিয়ে উপর্যপরি আঘাত করে হত্যা করেন। কেন্দুয়া থানার ওসি মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান জানান, ৪ দফা তদন্ত শেষে আদালতে স্বামী লিটন মিয়া সহ ৫ জনের বিরুদ্ধে দাখিলকৃত অভিযোগপত্রের শুনানী হবে আগামী ১৯ অক্টোবর।