করোনা প্রতিরোধ প্রয়াস: অম্ল মধুর অভিজ্ঞতা ও নিবেদন:ডিসি নেত্রকোনা

করোনা প্রতিরোধ প্রয়াস: অম্ল মধুর অভিজ্ঞতা ও নিবেদন:ডিসি নেত্রকোনা

ইকরা  প্রতিদিন অনলাইন ডেক্স: ১) গতকাল আমাদের হটলাইন নম্বরে একটি ফোন আসে খাদ্য সহায়তার জন্য।  পুনরায় ফোন করে তাঁর ঠিকানা নিশ্চিত হয়ে আমাদের কর্মকর্তা খাদ্য সহায়তা নিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছে যায়। যখন তাঁর হাতে খাবারের ব্যাগ হস্তান্তর করতে উদ্যত হয় তখন তিনি বলেন আসলে তাঁর এই সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তিনি শুধু পরীক্ষা করতে চেয়েছেন যে আসলেই ফোন করলে কাজ হয় কিনা। আমাদের কী করা উচিত??? সবিনয় অনুরোধ করছি আপনারা এই জাতীয় পরিহাস করবেন না। আপনার এই কৌতুকের কারণে অপর একজন হয়তো তাঁর প্রাপ্য এবং প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত  হলেন।
২) গতকাল অফিসিয়াল পেইজে একটি বড় স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। স্ট্যাটাসটির ওপর লাইক, কমেন্ট এবং শেয়ারের সংখ্যা আমাকে অভিভূত করেছে। চমৎকার পরামর্শ ও উপদেশ পাওয়া গেছে। সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। 
৩) একজন চমৎকার মন্তব্য করেছেন ‘আজকে গ্রামের বাড়ি থেকে আসলাম, কিন্তু ওখানে করোনা বলতে সবাই বুঝে পুলিশ আসলে পালাতে হবে। অনেকের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম যে, জ্বর, সর্দির কথা শুনলেই নাকি এম্বুলেন্সে করে রোগী নিয়ে ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলে পুলিশ। তাই, ওরা অসুস্থ হলেও কাউকে জানাবে না। জনসংখ্যার অর্ধেকের ও বেশি গ্রামের লোকজনের মনে এমন ধারণা থাকলে একটি দেশ কখনই করোনা প্রতিরোধ করতে পারবে না। তাই, গ্রামগুলিতে নজর দেওয়া অতি জরুরি’।  এটি যদি সত্য হয় তাহলে বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের। আমরা মাইকিং করাই কিংবা কিছুক্ষণের জন্য গিয়ে বলে আসি। চলে আসার পরে যদি পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায় তাহলে কিভাবে আমরা তাঁদের সচেতন করতে পারি?  প্রতিটি গ্রামে ২৪ ঘন্টার জন্য একটি করে টিম মোতায়েন করা কি বাস্তবে সম্ভব?
৪) আমরা আজ ০৬.০৪.২০২০ তারিখে নেত্রকোণাকে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে এবং এর প্রতিটি উপজেলাকে অন্য উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন (লক ডাউন) করার চেষ্টা করেছি। অনেকটা সফল হয়েছি। আগামীকাল থেকে আমাদের এই প্রচেষ্টা অধিকতর কঠোর হবে। আমরা প্রধান সড়কগুলো বন্ধ করেছি; তাঁরা ঘুরপথে তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছেছেন। আপনাদের দাবি ‘শতভাঘ লক-ডাউন’ কিভাবে বাস্তবায়ন করবো?
৫) আজ থেকে দুর্গাপুর উপজেলায় বালুর ট্রাক আসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারপরও কিছু কিছু ড্রাইভার মিথ্যা তথ্য দিয়ে কিংবা কোনোভাবে ভুল বুঝিয়ে দুর্গাপুর সড়কে প্রবেশ করেছে। আমরা সেগুলোকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
৬) আজ সকালে এবং সন্ধ্যার পরে নেত্রকোণা পৌরসভাতে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে ১২টি মামলা করা হয়েছে এবং প্রায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া, তথ্য পেয়ে চল্লিশা এবং আরও কয়েকটি স্থানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)গণ অভিযান চালিয়েছেন। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
৭) অনেকেই ফোন করে এবং ফেসবুক পেইজে অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁদের এলাকায়/গ্রাম এলাকায় অভিযান চালানোর অথবা একটা কিছু করার; না হলে সেখানকার তথা দেশের জন্য ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছে। আমার অনুরোধ আপনি আপনার এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে আপনার দায়িত্ব পালন করছেন তো? অবশ্যই আপনারা আমাদের বলবেন; একইসঙ্গে আমাদের সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও বিবেচনা করবেন।
৮) এখন চোর-পুলিশ খেলার সময় নয়। দেশের এই দুর্যোগের মূহুর্তে সকলেরই নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে এবং তা পালন করা আবশ্যক। আপনি বীরদর্পে ঘুরে বেড়াবেন, কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা মানবেন না; আর প্রশাসন কিংবা সরকার কী করেছে তা নিয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ(!)’ দিবেন কিংবা ‘খিস্তি-খেউর’ করবেন তাকি ঠিক? নিজেকে প্রশ্ন করুন।
৯) প্রত্যেকের নিজ নিজ এলাকায় একটি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করুন। অসচেতন ব্যক্তিদের সচেতন করার চেষ্টা করুন। যারা আপনাদের কথায় কর্ণপাত করবে না কিংবা করোনা ভাইরাসের ভয়ে ভীত নয় অর্থাৎ অত্যধিক সাহসী, তাঁদের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর আমাদের নিকট প্রেরণ করুন। করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা করার জন্য জনবল সংকট রয়েছে; আমরা ঐ সব সাহসী ব্যক্তিদের করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবা প্রদানের কাজে লাগাতে পারি।
১০) ধর্ম মন্ত্রণালয় দেশের বিশিষ্ট আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করে মসজিদে নামাজ পড়ার বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। সাধারণ জামাতে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ পাঁচজন এবং জুমার নামাজে দশজনের জামাত হবে। অন্যরা বাড়িতেই নামাজ পড়বেন। মনে রাখতে হবে সৌদিআরবে কারফিউ আরোপ করে মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জরুরি সময়ে এমন বিধান করা যায় বলেই সেখানে এই কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। তাই, আসুন বৃহত্তর স্বার্থে আমরাও এই নির্দেশ মেনে চলি। শবে বরাতের নামাজ ঘরেই পড়ি।
১১) অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। ধর্মকর্ম আপন ঘরে সেড়ে নিন। সার্বজনীন করার চেষ্টা করবেন না।
১২) রোগটি এমন যে এতে মারা গেলে জানাযা/দাহ/সৎকারের জন্য আপনার অতি আপনজনও উপস্থিত থাকতে পারবেন না।  যখন নিহতের সৎকার করা হবে তখন হয়তো তাঁর নিকটজন লক-ডাউনে থাকবেন। ভয়াবহতা একবার উপলব্ধি করুন।
১৩) প্রতিদিন আমাদের অবস্থান কঠোরতর হবে। তবে, আমরা যতই কঠোর হই না কেন আপনাদের সহযোগিতা এবং সচেতনতা ছাড়া সফলতা আসবে না। তাই, বিনীত অনুরোধ করছি, আপনারা ঘরে থাকুন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। না হলে শুধু নিজের জীবনই নয়, আপনার পরিবার, প্রতিবেশি এবং আমাদের সকলের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন। নিজের জীবন নিয়ে আপনি ঝুঁকি নিতেই পারেন; কিন্তু অন্যের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার অধিকার আপনার আছে কি? ভাবুন!!!
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে হেদায়েত ও হেফাজত করুন।